পসরাজ্ঞানের পসরা

পসরা / লেখা / বল, যন্ত্র ও শক্তি

বল, যন্ত্র ও শক্তি

সরল যন্ত্র কাকে বলে: সাতটি যন্ত্র, আর প্রতিটির হিসাব

৪ মিনিট পড়া · হালনাগাদ

সরল যন্ত্র বলতে এমন যন্ত্র বোঝায় যার কোনো ইঞ্জিন নেই, চলমান অংশ প্রায় নেই, আর যা একটা কাজকে সহজ করে দেয় শুধু বলটাকে অন্যভাবে সাজিয়ে। কাঁচি, দরজার হাতল, সিঁড়ির ঢাল, কুয়ার চাকা - সবই সরল যন্ত্র।

সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি এখানেই: সরল যন্ত্র কাজ কমায় না। যতটুকু কাজ করতে হতো, ততটুকুই করতে হয়। যন্ত্রটা শুধু ঠিক করে দেয় সেই কাজটা তুমি কতটা বল দিয়ে আর কতটা পথ ধরে করবে। কম বল লাগলে বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়, আর গুণফলটা প্রায় একই থাকে।

কাজ, বল আর দূরত্বের সম্পর্ক

পদার্থবিজ্ঞানে কাজ = বল × দূরত্ব। ৫০ কেজির একটা বস্তা এক মিটার উঁচুতে তুলতে যে কাজ লাগে, সেটা নির্দিষ্ট। তুমি সোজা তুলতে পারো, বা ঢালু তল বেয়ে ঠেলে তুলতে পারো - কাজের পরিমাণ একই।

পার্থক্যটা ভাগাভাগিতে। সোজা তুললে পুরো ৫০ কেজির সমান বল একবারে লাগবে, পথ এক মিটার। চার মিটার লম্বা ঢাল বেয়ে ঠেললে বল নেমে আসবে প্রায় এক-চতুর্থাংশে, কিন্তু পথ হবে চার গুণ। এই অদলবদলটাই সব সরল যন্ত্রের কাজ।

বাস্তবে ঘর্ষণের জন্য একটু বাড়তি কাজ লাগে, তাই কোনো যন্ত্রই শতভাগ দক্ষ নয়। কিন্তু নিয়মটা বদলায় না: কোনো যন্ত্র মোট কাজ কমাতে পারে না।

সাতটি সরল যন্ত্র, এক লাইনে

লিভার: একটা শক্ত দণ্ড আর একটা আলম্ব। আলম্ব বোঝার যত কাছে, তোমার বল তত কম, কিন্তু হাত তত বেশি নামাতে হবে। কাঁচি, শাবল, ঢেঁকি, এমনকি তোমার কনুই - সবই লিভার।

কপিকল: একটা চাকা আর রশি। বোঝাটাকে যতগুলো রশি ধরে আছে, বল তত ভাগ হয়ে যায়। দুটো রশি ধরলে বল অর্ধেক, কিন্তু রশি টানতে হবে দ্বিগুণ লম্বা।

ঢালু তল: উচ্চতা একই রেখে পথটা লম্বা করে দেওয়া। পাহাড়ি রাস্তা এঁকেবেঁকে ওঠে ঠিক এই কারণেই।

স্ক্রু: ঢালু তলকে গোল করে জড়িয়ে দেওয়া। প্যাঁচের ফাঁক যত ছোট, ঘোরাতে তত কম বল লাগে, কিন্তু ঘোরাতে হয় তত বেশি বার।

কীলক: দুটো ঢালু তল পিঠোপিঠি। কুড়াল, ছুরি, পেরেক - সবই কীলক। মাথা যত সরু, একই বলে ফাঁক তত বেশি।

চাকা ও অক্ষ: বড় চাকা ঘোরালে ছোট অক্ষে অনেক বেশি বল পাওয়া যায়। কুয়ার চাকা, দরজার নব, স্টিয়ারিং।

গিয়ার: দাঁতওয়ালা চাকা, একটা ঘুরলে পাশেরটা উল্টো দিকে ঘোরে। ছোট গিয়ার দ্রুত ঘোরে কম বলে, বড় গিয়ার ধীরে ঘোরে বেশি বলে - সাইকেলের গিয়ার এই কারণেই বদলানো হয়।

যান্ত্রিক সুবিধা কীভাবে বের করে

যান্ত্রিক সুবিধা = বোঝার বল ÷ তোমার দেওয়া বল। এটা একটা সংখ্যা, এর কোনো একক নেই।

ধরা যাক একটা লিভারে ৬০ কেজির বোঝা তুলতে তোমাকে ২০ কেজির সমান বল দিতে হলো। যান্ত্রিক সুবিধা ৬০ ÷ ২০ = ৩। মানে যন্ত্রটা তোমার বলকে তিন গুণ করে দিয়েছে, আর বদলে তোমার হাতকে তিন গুণ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।

সুবিধা ১-এর কম হলেও যন্ত্রটা অকেজো নয়। কিছু যন্ত্র ইচ্ছে করেই বল কমিয়ে গতি বাড়ায় - যেমন সাইকেলের উঁচু গিয়ারে প্যাডেলে বেশি চাপ লাগে, কিন্তু চাকা ঘোরে অনেক দ্রুত।

বাচ্চাকে বোঝানোর সবচেয়ে সহজ পথ

সংজ্ঞা মুখস্থ করানোর আগে হাতে ধরিয়ে দেওয়া ভালো। একটা স্কেল আর একটা পেন্সিল দিয়ে লিভার বানানো যায়: পেন্সিলটা আলম্ব, স্কেলের এক মাথায় একটা বই। পেন্সিলটা বইয়ের দিকে সরালেই স্কেল চাপতে সহজ লাগবে, আর সেটা নিজের হাতে টের পাওয়া যায়।

তারপর সংখ্যাটা দেখানো যায়। "কম বল লাগে" কথাটা যতক্ষণ না একটা অঙ্কে বদলায়, ততক্ষণ সেটা শুধু একটা অনুভূতি।

সংক্ষেপে কিছু প্রশ্ন

সরল যন্ত্র কয়টি?

প্রচলিত তালিকায় ছয়টি: লিভার, কপিকল, ঢালু তল, স্ক্রু, কীলক, আর চাকা ও অক্ষ। গিয়ারকে অনেক পাঠ্যবইয়ে আলাদা ধরা হয়, তখন সংখ্যাটা সাত হয়। গিয়ার আসলে চাকা ও অক্ষেরই একটা রূপ।

সরল যন্ত্র কি শক্তি বাঁচায়?

না। সরল যন্ত্র বল কমায়, শক্তি নয়। ঘর্ষণের কারণে বাস্তবে সামান্য বেশি শক্তিই খরচ হয়। যা বাঁচে তা হলো একবারে কতটা জোর লাগাতে হবে।

কাঁচি কোন ধরনের সরল যন্ত্র?

কাঁচি দুটো যন্ত্রের জোড়া: হাতলের দিকটা লিভার, আর ধারালো পাতা দুটো কীলক। এই কারণেই লম্বা হাতলের কাঁচিতে কাটা সহজ।

এবার নিজে নেড়ে দেখো

একই গুচ্ছের বাকি লেখা

← সব লেখা · বল, যন্ত্র ও শক্তি ভুবনে যাও

হোয়াটসঅ্যাপ